
একদিকে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানোর আবেগ, অন্যদিকে নতুন উৎসবের প্রস্তুতি। বিজয়া দশমীতে নদিয়ার শান্তিপুরের বড় গোস্বামী বাড়িতে ধরা পড়ল বাংলার এক ব্যতিক্রমী ধর্মীয় ঐতিহ্য। প্রায় সাড়ে তিনশো বছর ধরে এখানে দেবী দুর্গা পূজিত হয়ে আসছেন কাত্যায়নী রূপে। সেই আরাধনার সমাপ্তির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শান্তিপুরের বিখ্যাত রাস উৎসবের প্রস্তুতির প্রাচীন রীতি।
এখানকার দশমী কেবল প্রতিমা নিরঞ্জনের দিন নয়। বৈষ্ণব পরিবারের নিজস্ব আচার, রাধারমণ জিউর নিত্যসেবা এবং রাসযাত্রার প্রস্তুতি মিলিয়ে এই দিনটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
শান্তিপুরের বড় গোস্বামী বাড়ির দুর্গাপুজো বাংলার অন্যান্য বনেদি বাড়ির পুজো থেকে বেশ কিছু দিক দিয়ে আলাদা।
দশমীর সকালে নিয়ম মেনে সম্পন্ন হয় দেবী কাত্যায়নীর পুজো। পরিবারের মহিলারা অংশ নেন সিঁদুর খেলা ও অন্যান্য প্রথাগত অনুষ্ঠানে। এরপর নির্দিষ্ট রীতি মেনে দেবীকে নিরঞ্জনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়।
এই বিদায়পর্বের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরও একটি বিশেষ নিয়ম। পরিবারের ঐতিহ্য অনুযায়ী, দশমীর দিন রাস উৎসবের সূচনাসূচক খুঁটি পোঁতার অনুষ্ঠান হয়।
তাই কাত্যায়নীর বিসর্জন ঘিরে যেমন মনখারাপের আবহ থাকে, তেমনই পরবর্তী উৎসবের প্রস্তুতির আনন্দও জড়িয়ে থাকে।
বড় গোস্বামী বাড়ির কাত্যায়নী আরাধনার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি বহু পুরোনো লোককথা।
পরিবারের প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, একসময় তাঁদের প্রতিষ্ঠিত আরাধ্য বিগ্রহ দোলগোবিন্দ, যিনি রাধারমণ জিউ নামে পূজিত, মন্দির থেকে অন্তর্হিত হন।
বিগ্রহের সন্ধান না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা গভীর উদ্বেগে পড়েন। সেই সময় গোস্বামী পরিবারের মহিলারা দেবী কাত্যায়নীর ব্রত পালন শুরু করেন।
কথিত আছে, এই আরাধনার পর শান্তিপুরের কাছাকাছি দিঘনগর অঞ্চলের একটি জলাশয় থেকে বিগ্রহটি উদ্ধার করা হয়।
সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই বড় গোস্বামী বাড়িতে কাত্যায়নী পুজোর প্রথা প্রতিষ্ঠিত হয় বলে পরিবারের বিশ্বাস।
প্রায় ৩৫০ বছর ধরে এই আরাধনা বংশপরম্পরায় চলে আসছে।
শান্তিপুরের বড় গোস্বামী বাড়ি মূলত বৈষ্ণব ধর্মীয় ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত।
এখানে দেবী দুর্গার কাত্যায়নী রূপের আরাধনায় সেই বৈষ্ণব সংস্কৃতির প্রভাব স্পষ্ট।
প্রতিমার গঠনেও রয়েছে স্বাতন্ত্র্য। দেবীর দশটি হাত থাকলেও অধিকাংশ হাতেই প্রচলিত অস্ত্র দেখা যায় না। প্রতিমায় কার্তিক ও গণেশের অবস্থানেও রয়েছে অন্যান্য দুর্গাপ্রতিমার তুলনায় ভিন্নতা।
দেবীর পুজোয় নির্দিষ্ট ভোগ ও পারিবারিক রীতি অনুসরণ করা হয়। পরিবারের সংরক্ষিত ঐতিহ্য এবং পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া আচার মেনেই এই আরাধনা পরিচালিত হয়ে আসছে।
দশমীর দিন বড় গোস্বামী বাড়ির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রথাগুলির মধ্যে একটি হল ভোগ রান্নার বিশেষ নিয়ম।
পারিবারিক রীতি অনুযায়ী, দেবী কাত্যায়নীর নিরঞ্জন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বাড়ির প্রতিষ্ঠিত দেবতা রাধারমণ জিউর ভোগ রান্না শুরু হয় না।
এই কারণে অন্য দিনের তুলনায় দশমীর নিরঞ্জনের সময় বিশেষ গুরুত্ব পায়।
সকালের পুজো এবং আনুষঙ্গিক অনুষ্ঠান শেষে দেবীকে বিদায় জানানো হয়। নিরঞ্জনের পর শুরু হয় রাধারমণ জিউর ভোগ প্রস্তুতির কাজ।
পরিবারের সদস্যদের কাছে এই নিয়ম কেবল ধর্মীয় আচার নয়, পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নদিয়ার শান্তিপুর বললেই তাঁতশিল্পের পাশাপাশি যে উৎসবের কথা মনে আসে, তা হল ঐতিহ্যবাহী রাসযাত্রা।
বৈষ্ণব ধর্মীয় সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই উৎসবে শ্রীকৃষ্ণ ও রাধার উপাসনা বিশেষ গুরুত্ব পায়।
বড় গোস্বামী বাড়ির রাধারমণ জিউর সঙ্গে শান্তিপুরের রাস উৎসবের ইতিহাসের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
রাসের সময় রাধারমণ জিউকে বিশেষ সাজে সজ্জিত করা হয়। ভাঙারাস উপলক্ষে বিগ্রহকে নিয়ে নগর পরিক্রমার আয়োজনও ঐতিহ্যের অংশ।
দশমীতে কাত্যায়নীর বিদায়ের পর রাস উৎসবের প্রস্তুতি নতুন গতি পায়। তবে মূল রাসযাত্রার ধর্মীয় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয় কার্তিক মাসের পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে।
সময়ের সঙ্গে বদলেছে শান্তিপুরের সামাজিক পরিবেশ। বদল এসেছে জীবনযাত্রাতেও। কিন্তু বড় গোস্বামী বাড়ির ধর্মীয় আচারগুলির বহু অংশ আজও পুরোনো নিয়ম মেনে পালন করা হয়।
এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষেত্রে পরিবারের মহিলাদের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পুজোর আয়োজন থেকে শুরু করে নানা আচার পালনে তাঁরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
বড় গোস্বামী বাড়ির কাত্যায়নী পুজো তাই শুধুমাত্র একটি পারিবারিক দুর্গোৎসব নয়। এর সঙ্গে মিশে রয়েছে শান্তিপুরের বৈষ্ণব ইতিহাস, লোকবিশ্বাস এবং বহু প্রজন্মের স্মৃতি।
বিজয়ার বিদায়ঘণ্টা এখানে যেন আর একটি উৎসবের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে। কাত্যায়নীর নিরঞ্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দুর্গোৎসবের অধ্যায়, আর শান্তিপুরের মানুষ ধীরে ধীরে প্রস্তুত হন তাঁদের প্রিয় রাসযাত্রার জন্য।
আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো আবশ্যক