
আমেরিকায় চাকরির স্বপ্ন দেখা ভারতীয় পেশাদার এবং উচ্চশিক্ষার জন্য সে দেশে যাওয়া ছাত্রছাত্রীদের সামনে নতুন অনিশ্চয়তা। দক্ষ বিদেশি কর্মীদের নিয়োগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম H-1B ভিসা ব্যবস্থা নিয়ে কড়া অবস্থান নিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁর বক্তব্য, এই ভিসা কর্মসূচির বর্তমান কাঠামোয় গুরুতর সমস্যা রয়েছে এবং প্রয়োজন হলে গোটা ব্যবস্থাই বাতিল করার সিদ্ধান্তকে তিনি সমর্থন করবেন।
ভ্যান্সের মন্তব্য ঘিরে আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থান এবং অভিবাসন নীতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষত ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত পেশাদারদের কাছে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মার্কিন H-1B ভিসাপ্রাপকদের একটি বড় অংশই ভারতীয় নাগরিক।
তবে আতঙ্কের মধ্যেও একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা প্রয়োজন—ভ্যান্সের মন্তব্য কোনও সরকারি বাতিলের ঘোষণা নয়। H-1B ভিসা কর্মসূচি এখনও চালু রয়েছে।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট অভিযোগ করেন, দক্ষ বিদেশি প্রতিভাকে আমেরিকায় কাজের সুযোগ দেওয়ার জন্য যে ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল, তার অপব্যবহার করছে কিছু সংস্থা।
তাঁর দাবি, বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী নিয়োগের পরিবর্তে অনেক প্রতিষ্ঠান অপেক্ষাকৃত কম বেতনে বিদেশি কর্মী নিয়ে আসছে। এর ফলে আমেরিকার নাগরিকদের চাকরি এবং বেতনের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
নিজের বক্তব্য বোঝাতে তিনি একটি উদাহরণ দেন। কোনও মার্কিন নাগরিক বছরে ৬০ হাজার ডলার বেতন পেলে, তাঁর পরিবর্তে ৪৫ হাজার ডলারে বিদেশি কর্মী নিয়োগ করাকে প্রকৃত দক্ষতা-ভিত্তিক নিয়োগ বলা যায় না বলে মন্তব্য করেন ভ্যান্স।
তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, বিদেশি কর্মীদের দক্ষতার বিরোধিতা নয়, বরং কর্মসংস্থানের নিয়মকে ব্যবহার করে স্থানীয় শ্রমিকদের ক্ষতিগ্রস্ত করার প্রবণতা বন্ধ করা।
না। বর্তমান পরিস্থিতিতে H-1B ভিসা কর্মসূচি বন্ধ হয়ে গিয়েছে বা ভারতীয়দের জন্য আলাদাভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে—এমন কোনও ঘোষণা নেই।
ভ্যান্স কর্মসূচিটি বাতিল করার পক্ষে নিজের অবস্থান জানিয়েছেন। কিন্তু এই বক্তব্য এবং কার্যকর সরকারি সিদ্ধান্ত এক বিষয় নয়।
মার্কিন অভিবাসনব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। ফলে ভবিষ্যতে এই ভিসার নিয়ম আরও কঠোর হতে পারে বলে আশঙ্কা থাকলেও সম্পূর্ণ বাতিলের বিষয়টি এখনও অনিশ্চিত।
বিদেশি কর্মী নিয়োগকে আরও ব্যয়বহুল করার লক্ষ্যে ট্রাম্প প্রশাসন নির্দিষ্ট কিছু নতুন H-1B আবেদনের জন্য ১ লক্ষ মার্কিন ডলার অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের শর্ত আরোপের চেষ্টা করেছিল।
এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হিসেবে প্রশাসন জানিয়েছিল, সস্তা বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের প্রবণতা কমানো এবং আমেরিকান কর্মীদের চাকরির সুযোগ রক্ষা করা।
কিন্তু সিদ্ধান্তটি আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
২০২৬ সালের জুনে একটি ফেডারেল আদালত এই ফি আটকে দেয়। পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়াতেও প্রশাসন বাধার সম্মুখীন হয়। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ক্যালিফোর্নিয়ার আরও একটি ফেডারেল আদালত সংশ্লিষ্ট ফি কার্যকর করার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়।
ফলে অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত আদালতের নির্দেশে এই বিতর্কিত ১ লক্ষ ডলারের ফি আদায় বন্ধ রয়েছে। যদিও প্রশাসন ও বিরোধী পক্ষের আইনি লড়াই শেষ হয়নি।
H-1B ভিসা মূলত এমন বিদেশি পেশাদারদের জন্য ব্যবহৃত হয়, যাঁরা প্রযুক্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং, গবেষণা, অর্থনীতি এবং অন্যান্য বিশেষ দক্ষতানির্ভর ক্ষেত্রে কাজ করেন।
ভারতের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার এবং তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে এই কর্মসূচির অন্যতম প্রধান সুবিধাভোগী।
ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা টিসিএস, ইনফোসিস ও উইপ্রোর পাশাপাশি বিভিন্ন বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও দক্ষ কর্মী নিয়োগে এই ভিসা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে।
ভবিষ্যতে H-1B ভিসার সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত হলে ভারতীয় কর্মীদের মার্কিন চাকরির বাজারে প্রবেশ আরও কঠিন হতে পারে।
একই সঙ্গে সংস্থাগুলির আন্তর্জাতিক কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা, কর্মী স্থানান্তর এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প পরিচালনাতেও প্রভাব পড়তে পারে।
ভারত থেকে প্রতিবছর বহু শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকায় যান। তাঁদের একটি অংশ পড়াশোনা শেষ করার পর সেখানেই পেশাগত জীবন শুরু করতে চান।
অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা প্রথমে যোগ্যতা অনুযায়ী Optional Practical Training বা OPT-র মাধ্যমে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। এরপর নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় H-1B ভিসার আবেদন করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এই কারণে H-1B কর্মসূচিতে বড় পরিবর্তন হলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের দীর্ঘমেয়াদি কর্মজীবনের পরিকল্পনায় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে H-1B নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হওয়ার অর্থ এই নয় যে শিক্ষার্থী ভিসা, OPT বা বর্তমানে অনুমোদিত সব কর্মসংস্থানের সুযোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাচ্ছে।
বিদেশি দক্ষ কর্মীদের নিয়োগ নিয়ে মার্কিন প্রশাসন এবং প্রযুক্তি শিল্পের একাংশের মধ্যে মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
প্রশাসনের বক্তব্য, বিদেশি কর্মী নিয়োগের সুযোগ ব্যবহার করে কোনও প্রতিষ্ঠান যেন আমেরিকান নাগরিকদের কম বেতনের প্রতিযোগিতার মুখে না ফেলে।
অন্যদিকে, প্রযুক্তি শিল্পের বহু প্রতিনিধি মনে করেন, আন্তর্জাতিক প্রতিভা নিয়োগের সুযোগ সংকুচিত হলে গবেষণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে আমেরিকার প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ফলে এই বিতর্ক শুধু বিদেশি কর্মীদের ভিসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। আমেরিকার ভবিষ্যৎ শ্রমবাজার এবং প্রযুক্তি অর্থনীতির দিকনির্দেশও এর সঙ্গে যুক্ত।
H-1B ভিসা নিয়ে উদ্বেগ বাড়লেও আবেদনকারী এবং বর্তমানে কর্মরত পেশাদারদের কোনও রাজনৈতিক মন্তব্যকে চূড়ান্ত অভিবাসন বিধি হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
যাঁরা আমেরিকায় কাজ করছেন, তাঁদের বর্তমান ভিসা স্ট্যাটাস, নিয়োগকর্তার স্পনসরশিপ এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্রের বৈধতার দিকে নজর রাখা জরুরি।
অন্যদিকে, ভবিষ্যতে আমেরিকায় চাকরি করতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থী ও পেশাদারদের সরকারি অভিবাসন দফতরের নির্দেশিকা নিয়মিত যাচাই করা প্রয়োজন।
জেডি ভ্যান্সের বক্তব্য H-1B ভিসার ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। কিন্তু এখনই এই কর্মসূচির অবসান ঘটেছে বলে ধরে নেওয়ার কোনও কারণ নেই।
আগামী দিনে মার্কিন প্রশাসনের পরবর্তী সিদ্ধান্ত, নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ এবং আদালতের রায়ই নির্ধারণ করবে দক্ষ বিদেশি কর্মীদের জন্য আমেরিকার চাকরির দরজা কতটা খোলা থাকবে।
আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো আবশ্যক